পুতিনের যে ‘অদৃশ্য প্রযুক্তিতে’ রক্ষা পেল ইরানের সরকার

Md Parvez Hossen

January 20, 2026

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের সরকারকে পতনের হাত থেকে বাঁচাতে মূলত অত্যাধুনিক সাইবার প্রযুক্তি এবং গোয়েন্দা সহায়তা প্রদান করেছেন। এর মধ্যে প্রধান তিনটি হাতিয়ার হলো: ১. বিক্ষোভকারীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে উন্নত ইন্টারনেট সেন্সরশিপ সফটওয়্যার, ২. আন্দোলনের নেতাদের শনাক্ত করতে ফেসিয়াল রিকগনিশন ও সোশ্যাল মিডিয়া ট্র্যাকিং, এবং ৩. ইলন মাস্কের স্টারলিংক ইন্টারনেট অকেজো করতে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম। এটি মূলত ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের ড্রোন সহায়তার প্রতিদান।

২০২৬ সালের শুরুতে ইরানজুড়ে যে তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা পশ্চিমা বিশ্বের অনেকেই ভেবেছিলেন আয়াতুল্লাহ খামেনির সরকারের পতন ঘটাবে। কিন্তু হঠাৎ করেই দাবার চাল উল্টে যায়। আমেরিকা ও ইসরায়েলের সকল পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়ে ইরান সরকার পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যেই আন্দোলন সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল তেহরান, তা হঠাৎ শান্ত হলো কীভাবে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে মস্কো থেকে আসা এক বিশেষ সহায়তায়। চলুন, এই আর্টিকেলে আমরা সেই ‘অদৃশ্য বর্মের’ ব্যবচ্ছেদ করব।

রাশিয়া কেন ইরানকে বাঁচালো?

সহজ কথায়, এটি একটি ‘লেনদেনের সম্পর্ক’ (Reciprocal Relationship)। ইউক্রেন যুদ্ধে যখন রাশিয়া কোণঠাসা ছিল, তখন ইরানের তৈরি সস্তা কিন্তু কার্যকর ‘শাহেদ ড্রোন’ পুতিনের জন্য গেম চেঞ্জার হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এখন যখন ইরান বিপদে, তখন পুতিন সেই ঋণের প্রতিদান দিলেন। তবে পুতিনের স্বার্থ শুধু বন্ধুত্ব নয়, বরং নিজের অস্তিত্ব রক্ষা। পুতিন মনে করেন, ইরানে যদি পশ্চিমাপন্থী সরকার আসে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া তার একমাত্র বিশ্বস্ত মিত্রকে হারাবে। তাই খামেনিকে টিকিয়ে রাখা রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কী সেই রুশ প্রযুক্তি যা ইরানকে সুরক্ষা দিল?

একাত্তর টিভি ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, রাশিয়া গতানুগতিক অস্ত্র বা সৈন্য দিয়ে নয়, বরং আধুনিক ‘টেক-ওয়ারফেয়ার’ (Tech-Warfare) দিয়ে ইরানকে সহায়তা করেছে। বিষয়গুলো নিচে পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো:

  • ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও সেন্সরশিপ: আন্দোলনকারীরা যাতে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে না পারে, সেজন্য রাশিয়া তাদের উন্নত ইন্টারনেট ফিল্টারিং সফটওয়্যার ইরানকে দিয়েছে। এটি ভিপিএন (VPN) ভেদ করতেও সক্ষম।
  • ডিজিটাল গোয়েন্দা নজরদারি: বিক্ষোভের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা নেতাদের খুঁজে বের করতে রাশিয়া তাদের শক্তিশালী ফেসিয়াল রিকগনিশন (Facial Recognition) প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। এটি ভিড়ের মধ্যেও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারে।
  • সাইবার সুরক্ষা: ইরানের সরকারি ওয়েবসাইটগুলো যাতে পশ্চিমা হ্যাকারদের কবলে না পড়ে, সেজন্য রুশ সাইবার বিশেষজ্ঞরা সরাসরি কাজ করেছেন।

স্টারলিংক বনাম রুশ জ্যামার: আকাশের যুদ্ধ

ইরানের জনগণ যখন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কবলে পড়ে, তখন অনেকেই ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ‘স্টারলিংক’ ব্যবহারের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এখানেও রাশিয়া তাদের ‘ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম’ (Electronic Warfare System) কাজে লাগায়।

রাশিয়ার এই জ্যামিং প্রযুক্তি এতটাই শক্তিশালী যে, তা মহাকাশ থেকে আসা স্যাটেলাইট সিগন্যালকে বাধাগ্রস্ত করতে সক্ষম। ফলে ইরানের ভেতরে বিকল্প ইন্টারনেট ব্যবস্থা গড়ে তোলার পশ্চিমা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রশ্ন: রাশিয়া কি ইরানে সরাসরি সৈন্য পাঠিয়েছে?

উত্তর: না, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে রাশিয়া কোনো সৈন্য পাঠায়নি। তারা মূলত প্রযুক্তিগত সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য শেয়ারিং এবং সাইবার নিরাপত্তার মাধ্যমে ইরানকে সাহায্য করেছে।

প্রশ্ন: ‘কালার রেভলিউশন’ কী?

উত্তর: পুতিনের মতে, ‘কালার রেভলিউশন’ হলো পশ্চিমা দেশগুলোর (বিশেষ করে আমেরিকার) ইন্ধনে তৈরি করা কথিত গণবিক্ষোভ, যার উদ্দেশ্য হলো সরকার পরিবর্তন করা। পুতিন মনে করেন ইরানে যা হচ্ছিল, তা এই কালার রেভলিউশনেরই অংশ।

প্রশ্ন: ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি কি এখন সম্পূর্ণ শান্ত?

উত্তর: রাশিয়ার সহায়তায় ইরান সরকার আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। তবে ভেতরের ক্ষোভ পুরোপুরি প্রশমিত হয়েছে কি না, তা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।

আগামীর বিশ্ব ও প্রযুক্তির লড়াই

২০২৬ সালের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, আগামী দিনের যুদ্ধগুলো আর শুধু সীমান্তে হবে না; যুদ্ধ হবে ইন্টারনেটের দুনিয়ায়, ডেটা সার্ভারে এবং স্যাটেলাইটের তরঙ্গে। রাশিয়ার সহায়তায় ইরানের এই টিকে যাওয়া বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তির দখল যার হাতে, ক্ষমতাসহ টিকে থাকার চাবিকাঠিও তার হাতেই।

তথ্যসূত্র: একাত্তর টিভি রিপোর্ট (১৬ জানুয়ারি, ২০২৬), আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি জার্নাল।

Leave a Comment