আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী মূলত উত্তরবঙ্গ (রংপুর ও রাজশাহী) এবং খুলনা বিভাগকে তাদের প্রধান শক্তির ঘাঁটি বা ‘দুর্গ’ হিসেবে টার্গেট করেছে। সীমান্তবর্তী আসনগুলোতে নিজেদের প্রার্থী নিশ্চিত করে, তারা ঢাকা ও মধ্যাঞ্চলের আসনগুলো জোট শরিকদের (যেমন- এনসিপি ও খেলাফত মজলিস) জন্য ছেড়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, জামায়াতের বর্তমান ভোট ব্যাংক প্রায় ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এবার গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে অত্যন্ত কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। তাদের এই ‘মাস্টারপ্ল্যান’ কি আসলেই কোনো চমক দেখাবে? আসুন বিশ্লেষণ করি তাদের নির্বাচনী মানচিত্র।
কেন রংপুর ও রাজশাহীতে এত নজর?
জামায়াতে ইসলামীর অতীত নির্বাচনী ইতিহাস ও বর্তমান জরিপ বলছে, উত্তরবঙ্গ তাদের জন্য ‘উর্বর ভূমি’।
- রংপুর বিভাগ: ৩৩টি আসনের মধ্যে জামায়াত শরিকদের দিয়েছে মাত্র ৪টি। বাকি ২৯টিতেই নিজস্ব প্রার্থী। নিজস্ব জরিপ মতে, অন্তত ২৫টি আসনে তারা জয়ের আশা করছে।
- রাজশাহী বিভাগ: ৩৯টি আসনের মধ্যে মাত্র ৩টি ছেড়ে বাকি সবকটিতে নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে।
- খুলনা বিভাগ: এখানে ৩৬টির মধ্যে ৩৫টিই নিজেদের দখলে রেখেছে।
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে, জামায়াত এবার ‘মিনিমাম রিস্ক, ম্যাক্সিমাম গেইন’ নীতিতে এগোচ্ছে। অর্থাৎ যেখানে তাদের জয়ের সম্ভাবনা কম (যেমন ঢাকা বা মধ্যাঞ্চল), সেখানে শক্তি ক্ষয় না করে, যেখানে তাদের সংগঠন শক্তিশালী, সেখানেই পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করছে।
তারুণ্যের বাজি ও জোট রাজনীতি
জামায়াত এবার তাদের ছাত্রসংগঠন ও জোট শরিকদের মধ্যে এক নতুন সমন্বয় তৈরি করেছে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের তারা কৌশলে সমর্থন দিচ্ছে।
- এনসিপি-কে ছাড়: উত্তরবঙ্গে জামায়াতের শক্ত অবস্থান থাকা সত্ত্বেও পঞ্চগড়ে সার্জিস আলম, রংপুরে আখতার হোসেন এবং কুড়িগ্রামে ড. আতিক মুজাহিদ-এর জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এটি তাদের রাজনৈতিক উদারতা ও জোটের প্রতি আস্থার প্রতীক।
- ঢাকায় কৌশল: ঢাকায় জামায়াত সরাসরি প্রার্থী না দিয়ে নাহিদ ইসলাম ও নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারি এবং কুমিল্লায় হাসনাত আব্দুল্লাহ-এর মতো জনপ্রিয় তরুণ মুখদের বিজয়ী করতে কাজ করছে।
সীমান্তবর্তী আসনের রহস্য
একটি কৌতূহলউদ্দীপক তথ্য হলো, জামায়াত ভারত সীমান্তবর্তী আসনগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
- বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে এসব সীমান্ত এলাকায় জামায়াত ভালো ফল করেছিল।
- রংপুরের ১৭টি সীমান্তবর্তী আসনের মধ্যে ১৪টিতেই জামায়াত প্রার্থী দিয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের প্রস্থান: ক্ষতি না লাভ?
শুরুতে ২৫০ আসনে সমঝোতা হলেও শেষ মুহূর্তে ইসলামী আন্দোলন জোট ত্যাগ করে। এতে জামায়াতের লাভ ও ক্ষতি দুটিই হয়েছে।
- লাভ: জামায়াতের প্রার্থী সংখ্যা ১৭৯ থেকে বেড়ে ২২০-এর বেশি হয়েছে। এতে সারাদেশে তাদের ভোট প্রাপ্তির হার বাড়বে।
- ক্ষতি: বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগে ইসলামী আন্দোলনের ভোট ব্যাংক জামায়াতের জন্য সহায়ক হতে পারত, যা এখন ভাগ হয়ে যাবে।
সাধারণ মানুষের জন্য এই সমীকরণের অর্থ কী?
এই নির্বাচনী কৌশল থেকে সাধারণ ভোটাররা কয়েকটি বিষয় আঁচ করতে পারেন:
- দ্বিমুখী লড়াই: উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে লড়াইটা মূলত বিএনপি বনাম জামায়াতের মধ্যে হতে পারে, যেখানে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই দুই দলই প্রধান প্রতিপক্ষ।
- তরুণ নেতৃত্ব: সংসদে এবার বেশ কিছু তরুণ ও নতুন মুখ দেখার সম্ভাবনা প্রবল, যাদেরকে জামায়াত ও তাদের জোট সমর্থন দিচ্ছে।
- আঞ্চলিক রাজনীতি: জাতীয় রাজনীতির চেয়ে এবার আঞ্চলিক ইস্যু ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: জামায়াতের বর্তমান জনসমর্থন কত?
উত্তর: বিভিন্ন জরিপ সংস্থার মতে, জামায়াতের জনসমর্থন বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি।
প্রশ্ন: ঢাকায় কেন জামায়াত প্রার্থী দিচ্ছে না?
উত্তর: ঢাকায় জামায়াতের নিজস্ব ভোট ব্যাংক তুলনামূলক কম। তাই এখানে ভোট ভাগাভাগি না করে জোটের জনপ্রিয় ও তরুণ প্রার্থীদের সমর্থন দিয়ে বিজয় নিশ্চিত করাই তাদের কৌশল।
প্রশ্ন: এনসিপি (NCP) কারা?
উত্তর: এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) হলো সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গঠিত নতুন রাজনৈতিক শক্তি, যাদের সাথে জামায়াত জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করছে।
শেষ কথা
২০২৬-এর নির্বাচন জামায়াতে ইসলামীর জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। তারা যদি তাদের ‘উত্তরের দুর্গ’ রক্ষা করতে পারে এবং জোটের তরুণ নেতাদের সংসদে পাঠাতে পারে, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আসবে। আর যদি এই কৌশল ব্যর্থ হয়, তবে তাদের অস্তিত্বের সংকট তৈরি হতে পারে। ফলাফল যাই হোক, এই নির্বাচন যে এক নতুন বাংলাদেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা নিশ্চিত।
তথ্যসূত্র: নির্বাচনী জরিপ ডাটা।