ভাষাগতভাবে ‘Professor’ শব্দের আক্ষরিক বাংলা প্রতিশব্দ হলো ‘অধ্যাপক’। অর্থাৎ, শব্দগতভাবে এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তবে বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাঠামোতে ‘অধ্যাপক’ (Professor) হলো বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি কলেজের শিক্ষকতার সর্বোচ্চ পদমর্যাদা বা র্যাংক।
সাধারণ মানুষ সম্মান করে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষককেই ‘প্রফেসর’ বা ‘অধ্যাপক’ বলে সম্বোধন করেন। কিন্তু দাপ্তরিকভাবে কেবল তারাই ‘প্রফেসর’, যারা প্রভাষক (Lecturer), সহকারী অধ্যাপক (Assistant Professor) এবং সহযোগী অধ্যাপক (Associate Professor) পদের ধাপ পেরিয়ে পদোন্নতি পেয়েছেন।
প্রফেসর বনাম অধ্যাপক – আসল বিভ্রান্তি কোথায়?
আমরা অনেকেই ভাবি কলেজে বা ভার্সিটিতে যিনিই পড়াচ্ছেন, তিনিই প্রফেসর। কিন্তু বিষয়টি মোটেও তা নয়। একজন শিক্ষককে অফিসিয়ালি “প্রফেসর” হতে হলে তাকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পথ পাড়ি দিতে হয়। চলুন, বিষয়টি সহজভাবে ভেঙে দেখা যাক।
১. ভাষাগত মিল ও অমিল
- ভাষাগত দিক: ইংরেজিতে যাকে ‘Professor’ বলা হয়, বাংলায় তাকেই ‘অধ্যাপক’ বলা হয়। এটি কেবল ভাষার তফাৎ।
- ব্যবহারিক দিক: আমাদের সমাজে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, কলেজের স্যারদের সম্মান করে ‘প্রফেসর’ ডাকা হয়। এটি একটি সামাজিক শিষ্টাচার বা ‘Social Norm’, কিন্তু এটি তাদের অফিসিয়াল পদবি নাও হতে পারে।
২. একাডেমিক পদমর্যাদার ধাপ
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি কলেজগুলোতে (বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার) শিক্ষকদের পদমর্যাদা ৪টি প্রধান ধাপে বিভক্ত। নিচের ছকটি দেখলে আপনার ধারণা একদম পরিষ্কার হয়ে যাবে:
| ক্রম | পদবি (বাংলা) | পদবি (ইংরেজি) | অবস্থান |
| ১ | প্রভাষক | Lecturer | এন্ট্রি লেভেল বা শুরুর পদ |
| ২ | সহকারী অধ্যাপক | Assistant Professor | ২য় ধাপ (অভিজ্ঞতা ও প্রকাশনা সাপেক্ষে) |
| ৩ | সহযোগী অধ্যাপক | Associate Professor | ৩য় ধাপ (উচ্চতর গবেষণা প্রয়োজন) |
| ৪ | অধ্যাপক | Professor | সর্বোচ্চ পদমর্যাদা |
সুতরাং, একজন শিক্ষক তার ক্যারিয়ার শুরু করেন ‘প্রভাষক’ হিসেবে, কিন্তু তিনি অবসরে যেতে পারেন ‘প্রফেসর’ বা ‘অধ্যাপক’ হয়ে।
একজন ‘প্রফেসর’ বা ‘অধ্যাপক’ হওয়ার যোগ্যতা কী?
শুধুমাত্র বয়স বাড়লেই কেউ প্রফেসর হয়ে যান না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, এই পদটি পেতে হলে নির্দিষ্ট কিছু কঠিন শর্ত পূরণ করতে হয়:
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: সাধারণত পিএইচডি (PhD) বা সমমানের উচ্চতর ডিগ্রি থাকাটা প্রায় বাধ্যতামূলক (বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে)।
- গবেষণা ও প্রকাশনা: আন্তর্জাতিক বা জাতীয় মানের জার্নালে নির্দিষ্ট সংখ্যক গবেষণা প্রবন্ধ (Research Papers) প্রকাশিত হতে হয়।
- অভিজ্ঞতা: সাধারণত শিক্ষকতায় কমপক্ষে ১২ থেকে ১৫ বছরের (প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন হতে পারে) অভিজ্ঞতা থাকতে হয়।
- সুপারভাইজার: এমফিল বা পিএইচডি গবেষকদের তত্ত্বাবধান করার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়।
Note: অর্থাৎ, আপনি ক্লাসে যাকে ‘প্রফেসর’ বলে ডাকছেন, তিনি হয়তো কাগজ-কলমে এখনো ‘সহকারী অধ্যাপক’। কিন্তু সম্মানের খাতিরে এই ডাকটি বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য।
সচরাচর যা জানতে চাওয়া হয়
লেকচারার এবং প্রফেসরের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: লেকচারার (Lecturer) বা প্রভাষক হলেন শিক্ষকতার শুরুর পদের অধিকারী। অন্যদিকে প্রফেসর (Professor) হলেন সর্বোচ্চ পদের অধিকারী। একজন লেকচারার পদোন্নতি পেয়ে ভবিষ্যতে প্রফেসর হন।
সহকারী অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপকের কাজ কী?
উত্তর: উভয়েই শিক্ষকতা ও গবেষণার সাথে যুক্ত। তবে সহযোগী অধ্যাপক (Associate Professor) পদমর্যাদায় সহকারী অধ্যাপকের (Assistant Professor) চেয়ে সিনিয়র এবং তাদের বেতন স্কেল ও দায়িত্বের পরিধি বেশি।
সব কলেজ শিক্ষককেই কি প্রফেসর বলা যায়?
উত্তর: সামাজিকভাবে বলা যায়, কিন্তু দাপ্তরিকভাবে নয়। সরকারি কলেজে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তারাও নির্দিষ্ট সময় ও যোগ্যতা অর্জনের পরই কেবল ‘প্রফেসর’ পদে পদোন্নতি পান।
পিএইচডি ডিগ্রি থাকলেই কি সরাসরি প্রফেসর হওয়া যায়?
উত্তর: না। পিএইচডি থাকলে পদোন্নতি দ্রুত পাওয়া যায় বা অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট পাওয়া যায়, কিন্তু সরাসরি প্রফেসর পদে নিয়োগ পাওয়া যায় না (ব্যতিক্রম বাদে)। ধাপে ধাপে অভিজ্ঞতা ও প্রকাশনার মাধ্যমে এই পদে আসতে হয়।
প্রাইভেট ভার্সিটিতে কি প্রফেসরের সংজ্ঞা আলাদা?
উত্তর: মূল কাঠামো একই। তবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক সময় অবসরপ্রাপ্ত সরকারি প্রফেসরদের সরাসরি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখানেও প্রভাষক থেকে প্রফেসর হওয়ার জন্য ইউজিসির নির্দিষ্ট গাইডলাইন মানতে হয়।
‘মিস্টার প্রফেসর’ বলা কি সঠিক?
উত্তর: ইংরেজিতে কাউকে সম্বোধন করার সময় ‘Professor [Last Name]’ বলাটাই স্ট্যান্ডার্ড। যেমন: ‘Professor Ahmed’। বাংলায় ‘জনাব অধ্যাপক’ বা শুধুই ‘স্যার’ বলাটা শোভন।
লেখকের শেষ কথা ও পরামর্শ
সহজ কথায়, প্রফেসর ও অধ্যাপক একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একটি ইংরেজি শব্দ, অন্যটি বাংলা। তবে মনে রাখবেন, এটি কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি অর্জন।
আপনি যদি ছাত্র বা অভিভাবক হন, তবে শিক্ষকের পদবি যা-ই হোক, সম্মান প্রদর্শনে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ সম্বোধনই যথেষ্ট। আর যদি আপনি শিক্ষকতায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তবে জানবেন যে ‘প্রফেসর’ হওয়াটা আপনার ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত লক্ষ্যগুলোর একটি।